শেষ চিঠি — অলকা ভট্টাচার্য
রাত তখন প্রায় দুটো।
বৃদ্ধা মালতী দেবী তাঁর পুরনো কাঠের বাক্সটা খুললেন। আঙুলগুলো কাঁপছে। চোখে চশমা নেই, তবু তিনি জানেন ভেতরে কী আছে। চল্লিশ বছর ধরে জানেন।
একটা হলদে হয়ে যাওয়া চিঠি।
ভাঁজ করা। কখনো খোলা হয়নি।
সেদিন ছিল ১৯৮৩ সালের বর্ষাকাল। মালতীর বয়স তখন বাইশ। সদ্য বিয়ে হয়েছে। শ্বশুরবাড়ি এসেছেন মাত্র তিন মাস। স্বামী সুবীর কাজের জন্য আসামে গেছেন — বললেন দু'সপ্তাহে ফিরবেন।
দু'সপ্তাহ হয়ে গেল এক মাস।
এক মাস হয়ে গেল তিন।
চিঠি আসে। কিন্তু সুবীর আসেন না।
শেষ চিঠিতে সুবীর লিখেছিলেন — "মালতী, আমি একটু দেরি করে আসছি। কিন্তু এবার যখন আসব, তোমার হাতে একটা জিনিস দেব। সারাজীবন কাছে রেখো।"
সেই চিঠি পৌঁছানোর পরের দিন সকালে খবর এল।
আসামে বন্যায় ভেসে গেছেন সুবীর।
শরীর পাওয়া যায়নি।
মালতী দেবীর কোলে তখন তিন মাসের সন্তান।
শাশুড়ি বললেন, "বাপের বাড়ি চলে যাও। এখানে থেকে কী করবে?"
মালতী যাননি।
"এই বাড়িতে আমার স্বামী ছিলেন। এই মাটিতে তাঁর পায়ের ছাপ আছে। আমি কোথাও যাব না।"
তিনি রয়ে গেলেন। ছেলে বড় করলেন। বাড়ির রান্না করলেন। অন্যের বাড়িতে কাজ করলেন। কিন্তু সুবীরের শেষ চিঠিটা কখনো খোলেননি।
কারণ মালতী ভাবতেন — ওই চিঠিটা খুললেই সুবীর চলে যাবেন। পুরোপুরি।
খোলা না থাকলে হয়তো তিনি এখনো একটু... আছেন।
চল্লিশ বছর কেটে গেল।
ছেলে রাহুল বড় হয়েছে। বিয়ে করেছে। বিদেশে চলে গেছে। ভালো আছে।
মাঝে মাঝে ফোন করে — "মা, ওখানে একা থাকো না। এখানে চলে এসো।"
মালতী বলেন — "না রে। আমি এখানেই ভালো আছি।"
সেই রাতে হঠাৎ তাঁর মনে হল — আর কত?
আমার বয়স এখন বাষট্টি।
সুবীর চলে গেছেন চল্লিশ বছর আগে।
আর কতদিন একটা বন্ধ চিঠি আঁকড়ে বাঁচব?
তিনি চিঠিটা তুলে নিলেন।
ভাঁজ খুললেন।
চিঠিতে লেখা ছিল মাত্র কয়েকটা লাইন। সুবীরের হাতের লেখা — একটু এবড়োখেবড়ো, তাড়াতাড়ি লেখা।
"মালতী,
তুমি যখন এই চিঠি পড়ছ, তখন আমি হয়তো পাশে নেই।
কিন্তু একটা কথা বলে যাই।
তুমি যা ভাবো তুমি তার চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী।
আমার জন্য কাঁদো। সেটা তোমার অধিকার।
কিন্তু থেমে যেও না।
আমি তোমাকে ভালোবাসি বলেই জানি — তুমি থামার মানুষ নও।
— সুবীর"
মালতী দেবী অনেকক্ষণ চুপ করে বসে রইলেন।
তারপর খুব ধীরে, একটু একটু করে, কাঁদতে শুরু করলেন।
চল্লিশ বছরের কান্না।
একসঙ্গে।
পরের দিন সকালে মালতী দেবী ছেলেকে ফোন করলেন।
"রাহুল, আমি আসব। তোর কাছে আসব।"
ফোনের ওপারে রাহুল প্রায় কেঁদে ফেলল।
বিমানবন্দরে যাওয়ার আগে মালতী একবার ঘরটা দেখলেন।
পুরনো বাক্সটা রেখে গেলেন। চিঠিটা সঙ্গে নিলেন।
দরজা বন্ধ করার সময় মনে মনে বললেন —
"সুবীর, তুমি ঠিকই বলেছিলে। আমি থামার মানুষ নই।"
এই গল্পটা কেন লিখলাম?
আমাদের চারপাশে এমন অনেক মালতী আছেন।
যাঁরা কারো জন্য অপেক্ষা করতে করতে নিজেদের জীবন থামিয়ে রেখেছেন।
যাঁরা ভাবেন — এগিয়ে গেলে হয়তো যাকে ভালোবাসতাম, তাকে ছেড়ে দেওয়া হবে।
কিন্তু সত্যিটা হল — যাঁরা আমাদের সত্যিই ভালোবাসতেন, তাঁরা কখনো চাননি আমরা থেমে থাকি।
যদি এই গল্পটা মনে লাগে, শেয়ার করুন।
আপনার পরিচিত কেউ হয়তো আজ এই কথাটা শুনতে চাইছেন।
AB Sharing | alakabhattacharjee.com ||গল্পটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক। যেকোনো মিল সম্পূর্ণ অনিচ্ছাকৃত।
"জীবন এগিয়ে যায়। আমরাও যাই।"

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন