চরিত্রের আয়না

 



একটি সত্য ঘটনা অবলম্বনে


আমি জানি না এই গল্পটা বলা উচিত কিনা।

অনেকদিন ধরে মনের মধ্যে চাপা দিয়ে রেখেছিলাম। কিন্তু কিছু কথা আছে যেগুলো বুকের ভেতরে পাথরের মতো চাপা থাকে — বের না করলে দম বন্ধ হয়ে আসে।

তাই বলছি।

আমার নাম দিতে চাই না। শুধু বলি, আমি শিউলিপাড়ার মেয়ে। সেই পাড়ায় বড় হয়েছি, বিয়ে হয়েছে, সংসার করেছি। পাড়ার প্রতিটা ইট আমার চেনা। প্রতিটা গলি, প্রতিটা দরজা।

আর চেনা ছিলেন রেখা ভাবিও।


রেখা ভাবিকে যেভাবে চিনতাম

রেখা ভাবিকে না চেনার কোনো উপায় ছিল না।

পাড়ায় ঢুকলেই তাঁকে দেখা যেত — হয় কারো দরজায় দাঁড়িয়ে কথা বলছেন, নয়তো রাস্তার মোড়ে দুজন তিনজন মহিলাকে নিয়ে আলোচনায় বসে গেছেন। সবসময় তাঁতের শাড়ি, কপালে বড় সিঁদুরের টিপ, আর মুখে অদ্ভুত একটা হাসি — যে হাসি দেখলে মনে হয় এই মানুষটা পৃথিবীর সবচেয়ে নিরীহ প্রাণী।

আমরা ছোটবেলা থেকে দেখে আসছিলাম তাঁকে। মায়েরা বলত, "রেখা ভাবির মতো সংসারী হও।" বিয়েবাড়িতে তিনি না থাকলে যেন অনুষ্ঠানই হয় না। কেউ অসুস্থ হলে প্রথম যিনি খোঁজ নিতে আসেন — রেখা ভাবি। বন্যায় ত্রাণ লাগলে, পাড়ায় কোনো সমস্যা হলে — রেখা ভাবি।

মানুষটাকে আমরা সত্যিই শ্রদ্ধা করতাম।

কিন্তু রেখা ভাবির একটা বিষয় ছিল যেটা আমরা তখন বুঝিনি।

তিনি মানুষের চরিত্র বিচার করতেন।

মানে শুধু মতামত দিতেন না — রীতিমতো রায় দিতেন। কে ভালো, কে খারাপ, কার সংসার টিকবে, কার টিকবে না — এই সব বিষয়ে তাঁর কাছে যেন একটা অদৃশ্য দাঁড়িপাল্লা ছিল। আর সেই পাল্লায় একবার কেউ হালকা হয়ে গেলে পাড়ায় তার মাথা তুলে চলা কঠিন হয়ে যেত।

তখন আমরা ভাবতাম — উনি বোধহয় সত্যিই বুঝতে পারেন মানুষ।

কতটা ভুল ছিলাম সেটা বুঝলাম অনেক পরে।


মিতু যেদিন এলো

শীত শেষ হচ্ছিল তখন। ফাল্গুনের শুরু।

সুজন ভাই — পাড়ার ছেলে, ভালো চাকরি করে — বিয়ে করে আনল মিতুকে।

মিতুকে প্রথম দেখেছিলাম বিয়ের পরের দিন সকালে। সে তখন উঠানে দাঁড়িয়ে চুল বাঁধছিল। সহজ সরল চেহারা, পরনে সাধারণ সুতির শাড়ি, মুখে হাসি। দেখে মনে হলো মেয়েটা ভালোই হবে।

মিতু শহরের মেয়ে। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়াশোনা করেছে, একটা বেসরকারি অফিসে চাকরি করে। বিয়ের পরেও চাকরি ছাড়েনি। সকালে উঠে শাশুড়িকে সালাম দেয়, রান্নাঘরে হাত লাগায়, তারপর অফিসে যায়।

আমার কাছে এটা স্বাভাবিক মনে হয়েছিল।

রেখা ভাবির কাছে মনে হয়নি।

প্রথম সপ্তাহেই রেখা ভাবি আমাকে ডেকে বললেন, কণ্ঠস্বর নামিয়ে, যেন মহাগুরুত্বপূর্ণ কথা বলছেন — "সুজনের বউটা দেখলি? সারাদিন বাইরে বাইরে। শাশুড়ি একা বাড়িতে পড়ে থাকেন। এই বউ দিয়ে সংসার হবে না।"

আমি কিছু বলিনি। কিন্তু মনে মনে একটু অবাকই হয়েছিলাম। মেয়েটা তো সবে এলো। এখনই এত বড় রায়?

কিন্তু তখনো আমি রেখা ভাবির বিরুদ্ধে কিছু ভাবতে পারিনি। পাড়ায় বড় হওয়া মানুষ — মাথার মধ্যে গেঁথে গিয়েছিল যে উনি যা বলেন সেটাই ঠিক।


যেভাবে বিষ ছড়াল

এরপর যা হলো সেটা আমি সামনে থেকে দেখেছি।

রেখা ভাবি একদিন গেলেন মিতুর শাশুড়ি করুণা দেবীর কাছে। আমি পাশের ঘরে ছিলাম, দরজা ভেজানো। পুরোটা শুনলাম।

চায়ের কাপ হাতে নিয়ে রেখা ভাবি বললেন, "করুণাদি, একটা কথা বলব? কিছু মনে করবেন না।"

করুণা দেবী বললেন, "বলো বলো, তুমি তো আপনার মানুষ।"

"আপনার বউমাকে দেখছি... মানে ঠিক বলতে পারছি না... তবে ওই ছাদে যে ছেলেটা আসে মাঝে মাঝে, ওটা কে? সুজন কি জানে?"

ঘরে যেন বাতাস থেমে গেল।

করুণা দেবী কাঁপা গলায় বললেন, "কোন ছেলে?"

"আরে সেদিন দেখলাম না, ছাদে দাঁড়িয়ে কথা বলছে। আমি কিছু বলছি না, হয়তো অফিসের কেউ হবে। কিন্তু একটু সাবধানে রাখুন। আজকালকার মেয়েরা..."

বাকিটা আর বললেন না।

বলতে হলো না।

সেই রাতে বাড়িতে ঝগড়া হলো। মিতুর কান্নার শব্দ পাড়ার অনেকেই শুনতে পেয়েছিল। আমিও শুনেছিলাম।

শুনে বুকটা ভারী হয়ে গিয়েছিল।

কারণ আমি জানতাম — ওই ছেলেটা মিতুর কলেজের বন্ধু। বোনের বিয়ের কার্ড দিতে এসেছিল। আমি নিজে দেখেছিলাম।

কিন্তু সেদিন কিছু বলিনি।

এই না বলাটার জন্য এখনো নিজেকে ক্ষমা করতে পারি না।


হাসনা নানুর কথা

পাড়ায় একজন মানুষ ছিলেন যাঁকে সবাই একটু ভয় পেত।

ভয় না বলে সমীহ বলা ঠিক হবে।

হাসনা নানু। বয়স সত্তরের বেশি। রেখা ভাবির পাশের বাড়িতে থাকেন একা। ছেলেমেয়ে বিদেশে। সারাদিন জানালার পাশে বসে থাকেন, তসবিহ টানেন।

মানুষ ভাবত উনি কিছু দেখেন না, কিছু জানেন না।

আসলে উনি সব দেখতেন। সব জানতেন।

আমি একদিন নানুর কাছে গিয়েছিলাম। কেন গিয়েছিলাম ঠিক মনে নেই — হয়তো মনটা খারাপ ছিল, হয়তো কাউকে বলতে চাইছিলাম। নানু আমাকে চা দিলেন। তারপর নিজেই শুরু করলেন।

"রেখাকে চেনিস তো?"

"চিনি নানু।"

"কতটুকু চেনিস?"

আমি চুপ করে রইলাম।

নানু বললেন, "প্রতি বৃহস্পতিবার দুপুরে একটা রিকশা আসে রেখার বাড়িতে। লক্ষ্য করেছিস কখনো?"

আমি মাথা নাড়লাম।

"আমি করেছি। বহুদিন ধরে। একবার বাজারে কথা হয়েছিল ওই মানুষটার সাথে। রেখার মামাতো ভাই বলে পরিচয় দেয় সে। কিন্তু রেখার কোনো মামা ছিল না — আমি জানি। ছোটবেলা থেকে দেখেছি এই পাড়ায়।"

ঘরে নিঃশব্দতা নামল।

নানু আস্তে বললেন, "যে মানুষ নিজে অন্ধকারে থাকে, সে চায় সবাই অন্ধকারে থাকুক। তাহলে তার অন্ধকারটা আর আলাদা করে চোখে পড়ে না।"

সেদিনের পর থেকে রেখা ভাবিকে আমি অন্যভাবে দেখতে শুরু করলাম।


যেদিন সব ভেঙে পড়ল

ঘটনাটার কথা পাড়ার সবাই জানে।

বৃহস্পতিবার দুপুর। রেখা ভাবির বাড়িতে সেই রিকশা এলো। লোকটা নামল।

সেদিন গোপাল বাবু বাড়িতে ছিলেন। হাসপাতালের অ্যাপয়েন্টমেন্ট ক্যান্সেল হয়ে গিয়েছিল।

গোপাল বাবু দরজা খুললেন।

আমি তখন রাস্তায় ছিলাম। দূর থেকে দেখলাম। সবটা দেখলাম।

গোপাল বাবু শান্তগলায় শুধু বললেন, "তোমার কোনো মামাতো ভাই নেই রেখা। তোমার মামা তিরিশ বছর আগে মারা গেছেন।"

রেখা ভাবি কিছু বলতে পারলেন না।

দরজাটা বন্ধ হয়ে গেল।

আমি দাঁড়িয়ে রইলাম। পায়ের নিচের মাটিটা কেমন সরে যাচ্ছিল মনে হলো। এত বছর ধরে যাঁকে আদর্শ মেনেছি — তাঁর এই মুখটা?

কিন্তু সেই মুহূর্তে কষ্টের চেয়ে বেশি যেটা হলো — সেটা হলো লজ্জা।

নিজের জন্য লজ্জা।

কারণ এই মানুষটার কথায় বিশ্বাস করে আমিও মিতু সম্পর্কে মনে মনে কত কী ভেবেছিলাম।


মিতুর সাথে যেদিন কথা হলো

ঘটনার কিছুদিন পর মিতুর সাথে আমার কথা হয়েছিল।

সন্ধ্যায় ছাদে। দুজনে পাশাপাশি বসেছিলাম।

মিতু বলল, "ভাবি, জানেন সবচেয়ে কষ্টের কী ছিল?"

আমি বললাম, "কী?"

"রেখা ভাবির কথা না। সুজনের চুপ করে থাকাটা। একটু যদি বলত — 'আমি তোমাকে বিশ্বাস করি' — ব্যস, এটুকুই যথেষ্ট ছিল। সেটা পাইনি।"

আমি কিছু বললাম না।

মিতু বলল, "আমি বুঝি মানুষ কথায় বিশ্বাস করে। রেখা ভাবি অনেকদিনের পরিচিত, আমি নতুন। কিন্তু একটাই প্রশ্ন করতাম — যে মানুষ অন্যের ঘরের হিসাব এত ভালো করে রাখে, সে কি নিজের ঘরের খোঁজ রাখে?"

সেই কথাটা এখনো কানে বাজে।


রেখা ভাবিকে শেষবার যেভাবে দেখলাম

এই গল্পের শেষটা আমার জন্য সবচেয়ে কঠিন।

কারণ রেখা ভাবিকে আমি ঘৃণা করতে পারিনি।

রাগ হয়েছিল। প্রচণ্ড রাগ। কিন্তু ঘৃণা — না।

একদিন বিকেলে দেখলাম তিনি একা বসে আছেন তাঁর দরজার সামনে। চোখে অদ্ভুত একটা ভাব — যে ভাবকে একটা শব্দেই বলা যায়। একাকীত্ব।

পাড়ার মানুষ এড়িয়ে যাচ্ছে। যে বাড়িগুলোতে একসময় তাঁর ডাক পড়ত — সেই দরজাগুলো এখন বন্ধ। বিয়েবাড়িতে ডাক আসে না। চায়ের নিমন্ত্রণ নেই।

তিনি আমার দিকে তাকালেন।

আমি একটু ইতস্তত করলাম। তারপর এগিয়ে গেলাম।

"কেমন আছেন ভাবি?"

তিনি একটু চমকালেন। তারপর ধরা গলায় বললেন, "ভালো না রে।"

আর কিছু বললেন না। আমিও কিছু জিজ্ঞেস করলাম না।

কিছুক্ষণ পাশে বসে রইলাম। তারপর উঠে গেলাম।

যেতে যেতে ভাবলাম — এই মানুষটা কি জানতেন না যে তিনি কী করছেন? নাকি জানতেন, কিন্তু থামতে পারেননি?

এই প্রশ্নের উত্তর আজও জানি না।


যা বুঝলাম

এই গল্পটা বলতে গিয়ে বারবার নিজেকেও প্রশ্ন করেছি।

আমিও কি কখনো রেখা ভাবির মতো করিনি? কারো সম্পর্কে বিনা প্রমাণে মনে মনে রায় দিইনি? কারো গল্প না জেনে তার চরিত্র নিয়ে মাথা ঘামাইনি?

সৎ উত্তর হলো — হয়তো করেছি।

হয়তো আমরা অনেকেই করি।

মানুষের চরিত্র নিয়ে কথা বলা অনেকটা সহজ। নিজের দিকে তাকানো কঠিন। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে সত্যিকারের নিজেকে দেখা — সেটা সবচেয়ে কঠিন কাজ।

রেখা ভাবি সেই আয়নার সামনে দাঁড়াননি। দাঁড়ালে হয়তো মিতুর সংসারে এত ঝড় আসত না। গোপাল বাবুর চোখে এত কষ্ট থাকত না।

আর আমরা যারা চুপ করে দেখেছি — আমাদেরও দায় আছে।

সত্য জেনেও চুপ থাকা মানে মিথ্যার সাথে হাত মেলানো।

এটাও শিখেছি এই ঘটনা থেকে।


শেষ কথা

শিউলিপাড়া এখনো আছে।

মিতু এখনো অফিস করে। সুজন এখন অনেক বেশি বোঝে স্ত্রীকে। করুণা দেবী মেয়ের মতোই ভালোবাসেন মিতুকে।

হাসনা নানু গত বছর চলে গেছেন। শেষ বয়সে তিনি একটা কথা বলেছিলেন যেটা আমি লিখে রেখেছি ডায়েরিতে —

"মানুষের চরিত্র বিচার করার আগে একবার নিজের বুকে হাত দিয়ে জিজ্ঞেস করো — আমি কি পরিষ্কার?"

রেখা ভাবি এখনো পাড়ায় থাকেন।

তবে এখন আর কারো চরিত্র নিয়ে কথা বলেন না।

হয়তো শিখেছেন। হয়তো বুঝেছেন।

অথবা হয়তো শুধু চুপ হয়ে গেছেন।

সেটা তিনিই জানেন।


নিজেদের চরিত্রের ঠিক নেই — তারাই আসে অন্যদের চরিত্র বিচার করতে। এই সত্যটা আমি একটা পাড়ার গল্প থেকে শিখেছি। হয়তো তুমিও চেনো এরকম কাউকে। হয়তো সে তোমার পাড়ায়। হয়তো তোমার খুব কাছে।

হয়তো সে তুমি নিজেই।


— শিউলিপাড়ার একজন

মন্তব্যসমূহ