চরিত্রের আয়না
একটি সত্য ঘটনা অবলম্বনে
প্রথম পর্ব — মহল্লার রানি
শিউলিপাড়ার গলির মোড়ে যদি কাউকে জিজ্ঞেস করতেন, "এই পাড়ার সবচেয়ে ভালো মানুষ কে?" — তাহলে নব্বই ভাগ মানুষ একটাই নাম বলত।
রেখা ভাবি।
রেখা চৌধুরী। বয়স পঞ্চাশের কোঠায়। গায়ের রং উজ্জ্বল ফর্সা, সবসময় তাঁতের শাড়ি পরেন, কপালে বড় একটা সিঁদুরের টিপ, আর ঠোঁটে সবসময় হাসি। দেখলে মনে হয় সাক্ষাৎ গৃহলক্ষ্মী। পাড়ার সব বিয়েতে তিনি সাজসজ্জায় থাকেন, সব অসুখে তিনি পথ্য নিয়ে যান, সব ঝামেলায় তিনি মধ্যস্থতা করেন।
কিন্তু রেখা ভাবির একটা বিশেষ গুণ ছিল।
তিনি মানুষের চরিত্র বিচার করতে পারতেন। অন্তত তিনি নিজে তা-ই মনে করতেন।
"ওই মেয়েটার চলাফেরা দেখেছ? সন্ধ্যার পরে একা একা বাইরে যায়। চরিত্র ভালো না।"
"ওই বাড়ির বউটা শাশুড়ির সাথে কথা বলে না ঠিকমতো। স্বামীকে হাতে রেখেছে। মেয়েমানুষ এরকম হলে সংসার টেকে না।"
"ওই ছেলেটা রাত করে বাড়ি ফেরে। নিশ্চয়ই কোনো বদ কাজ করে।"
রেখা ভাবির রায় মানে পাড়ার রায়। তিনি একবার কারো সম্পর্কে মুখ খুললে সেই মানুষটার পাড়ায় মাথা তুলে চলা কঠিন হয়ে যেত।
দ্বিতীয় পর্ব — নতুন বউ
সেই বছর শীতের শেষে পাড়ায় নতুন বউ এলো।
নাম মিতু। পুরো নাম মিতুল রহমান। বয়স সাতাশ। শহরের মেয়ে, বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেছে, চাকরি করে একটা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে। বিয়ে হয়েছে পাড়ার সুজন ভাইয়ের সাথে।
মিতু এলো তার নিজের মতো করে।
সকালে উঠে শাশুড়িকে সালাম দেয়, রান্নাঘরে হাত লাগায়, কিন্তু তারপর অফিসে যায় — পরিপাটি পোশাকে, চুল বাঁধা, কাঁধে ব্যাগ। সন্ধ্যায় ফেরে, কখনো একটু রাত হয় ট্র্যাফিকের কারণে। ছাদে উঠে ফোনে কথা বলে। বন্ধুরা আসে মাঝে মাঝে, ছেলে-মেয়ে মিলিয়ে দল।
রেখা ভাবির তীক্ষ্ণ চোখ সব দেখে।
প্রথম সপ্তাহেই রায় বেরিয়ে গেল।
"সুজনের বউটা দেখলে? সংসার করতে আসছে না শখ মেটাতে আসছে বোঝা দায়। সারাদিন বাইরে বাইরে। শাশুড়ি একা পড়ে থাকেন। এই বউ দিয়ে সুজনের সংসার টিকবে না।"
কথাটা কানে কানে পুরো পাড়ায় ছড়িয়ে গেল।
মিতু কিছুই জানে না। সে নিজের মতো করে সংসার সামলায়, অফিস করে, হাসিমুখে থাকে।
তৃতীয় পর্ব — অভিযানের শুরু
রেখা ভাবি শুধু কথায় থামলেন না।
একদিন তিনি মিতুর শাশুড়ি — মানে সুজনের মা করুণা দেবীর কাছে গেলেন। চায়ের কাপ হাতে বসলেন। তারপর শুরু করলেন।
"করুণাদি, আমি কিছু বলব? আপনি কিছু মনে করবেন না।"
করুণা দেবী সরল মানুষ। বললেন, "বলো ভাই, তুমি তো আপনার মানুষ।"
"আপনার বউমাকে দেখছি... মানে ঠিক বলতে পারছি না... তবে ওই ছাদে যে ছেলেটা আসে মাঝে মাঝে, ওটা কে? সুজন কি জানে?"
করুণা দেবীর মুখ পাংশু হয়ে গেল।
"কোন ছেলে?"
"আরে সেদিন দেখলাম না, ছাদে দাঁড়িয়ে কথা বলছে। আমি কিছু বলছি না, হয়তো অফিসের কেউ। কিন্তু একটু সাবধানে রাখা ভালো। আজকালকার মেয়েরা..."
বাকিটা আর বলতে হলো না। ইঙ্গিতটুকুই যথেষ্ট।
সেই রাতে করুণা দেবী ছেলেকে ডেকে বললেন সব। সুজন অবাক হলো, তারপর রাগ হলো, তারপর সংসারে প্রথমবার ঝগড়া হলো।
মিতু কাঁদল।
"ওই ছেলেটা আমার কলেজের বন্ধু আরিফ। ওর বোনের বিয়ের কার্ড দিতে এসেছিল। তুমি কি আমাকে বিশ্বাস করো না?"
সুজন চুপ করে রইল।
সেই চুপ থাকাটাই সবচেয়ে বড় কষ্ট দিল মিতুকে।
চতুর্থ পর্ব — রেখা ভাবির গোপন জীবন
কিন্তু শিউলিপাড়ায় একজন মানুষ সব জানত।
নাম হাসনা বেগম। রেখা ভাবির ঠিক পাশের বাড়ির বৃদ্ধা। বয়স সত্তরের বেশি। সারাদিন জানালার পাশে বসে থাকেন, তসবিহ টানেন, আর দেখেন।
হাসনা বেগম দেখেছেন অনেক কিছু।
দেখেছেন, প্রতি বৃহস্পতিবার দুপুরে রেখা ভাবির বাড়িতে একটা রিকশা আসে। রিকশা থেকে নামে একজন মধ্যবয়সী পুরুষ। পরিচয়? রেখা ভাবির "মামাতো ভাই।" কিন্তু হাসনা বেগমের সাথে ওই মানুষটার একবার দেখা হয়েছিল বাজারে। কথায় কথায় বেরিয়ে এসেছিল — সে রেখার মামাতো ভাই নয়। পুরনো পরিচয়। কলেজের।
দেখেছেন, রেখা ভাবির স্বামী গোপাল বাবু মাসের পর মাস অসুস্থ থাকেন। সংসারের খরচ কোথা থেকে আসে? গোপাল বাবুর উপার্জন নেই বললেই চলে। অথচ রেখা ভাবির গলায় নতুন গহনা উঠছে।
দেখেছেন, পাড়ার যে মেয়েগুলোর "চরিত্র" নিয়ে রেখা ভাবি সবচেয়ে বেশি সরব — তারা বেশিরভাগই সুন্দরী এবং স্বাবলম্বী।
হাসনা বেগম চুপ থাকতেন। বয়স হলে মানুষ বোঝে — কিছু কথা বললে শুধু ঝামেলা বাড়ে।
কিন্তু মিতুর কান্নার শব্দ তাঁর কানে এসে পৌঁছাল।
পঞ্চম পর্ব — ভাঙনের মুখে
সুজন-মিতুর সংসারে ফাটল ধরল ধীরে ধীরে।
সুজন সন্দেহ করে না ঠিকই, কিন্তু মায়ের কথা ফেলতেও পারে না। মা প্রতিদিন কানে কানে বলেন রেখা ভাবির কথা। রেখা ভাবি প্রতিদিন নতুন কোনো "পর্যবেক্ষণ" নিয়ে হাজির হন।
"আজ দেখলাম অফিস থেকে ফিরতে সাতটা বাজল। প্রতিদিন কি অফিস এতক্ষণ থাকে?"
"মিতু নাকি তার মাকে বেশি মানে, শাশুড়িকে কম।"
"শুনলাম মিতু নাকি অফিসে পুরুষ সহকর্মীদের সাথে বাইরে খেতে যায়।"
একটার পর একটা মিথ্যা, আধা-সত্য, আর ইঙ্গিত। প্রতিটা কথা বিষের মতো একটু একটু করে ঢুকছে করুণা দেবীর মনে। সেখান থেকে সুজনের মনে।
মিতু বুঝতে পারছিল কিছু একটা হচ্ছে। কিন্তু কী হচ্ছে, কোথা থেকে হচ্ছে — ধরতে পারছিল না।
একদিন সে ছাদে একা বসে কাঁদছিল।
হাসনা বেগম দেখলেন।
ষষ্ঠ পর্ব — বৃদ্ধার সিদ্ধান্ত
হাসনা বেগম সেদিন উঠলেন।
বাতের ব্যথায় হাঁটতে কষ্ট হয়। তবু লাঠি ভর দিয়ে সিঁড়ি বেয়ে উঠলেন। ছাদে গেলেন।
মিতু চমকে উঠল।
"নানু? আপনি এতটা উপরে?"
হাসনা বেগম পাশে বসলেন। হাতটা ধরলেন।
"মা, তুমি কাঁদছ কেন?"
মিতু প্রথমে বলতে চাইল না। তারপর একটু একটু করে বলল সব। রেখা ভাবির কথা, শাশুড়ির সন্দেহ, সুজনের দূরত্ব।
হাসনা বেগম সব শুনলেন।
তারপর বললেন, "মা, আমি তোমাকে একটা গল্প বলি।"
"অনেক বছর আগের কথা। এই পাড়ায় একটা মেয়ে থাকত। সে সবার চরিত্র নিয়ে কথা বলত। বলত অমুকের বউ ভালো না, তমুকের মেয়ে বেহায়া। সবাই তাকে বিশ্বাস করত, কারণ সে সবসময় হাসিমুখে থাকত।"
"কিন্তু সেই মেয়ে নিজে কী করত জানো? সে নিজের স্বামীকে ঠকাত। প্রতি সপ্তাহে অন্য একজনের সাথে দেখা করত। সংসারের টাকা অন্যদিকে যেত।"
মিতু চুপ করে শুনছিল।
"সে মানুষের চরিত্র নিয়ে কথা বলত কারণ সে নিজেই ভয়ে থাকত। ভাবত, আমি যদি অন্যদের দিকে সবার মনোযোগ ঘুরিয়ে রাখি, তাহলে কেউ আমার দিকে তাকাবে না।"
মিতু আস্তে আস্তে বলল, "নানু, এই মেয়েটা কি...?"
হাসনা বেগম চুপ করে রইলেন।
তারপর বললেন, "মা, সত্য লুকিয়ে রাখা যায় না বেশিদিন। তুমি শুধু তোমার কাজ করতে থাকো।"
সপ্তম পর্ব — উন্মোচন
সেই সপ্তাহেই ঘটনাটা ঘটল।
বৃহস্পতিবার দুপুর।
রেখা ভাবির বাড়িতে যখন সেই "মামাতো ভাই" এলেন — সেদিন ভাগ্যক্রমে গোপাল বাবু বাড়িতে ছিলেন। হঠাৎ করে হাসপাতালের অ্যাপয়েন্টমেন্ট ক্যান্সেল হয়ে গিয়েছিল।
গোপাল বাবু দরজা খুললেন।
সামনে একজন অচেনা পুরুষ।
"কে আপনি?"
লোকটা থতমত খেল।
রেখা ভাবি ভেতর থেকে ছুটে এলেন। মুখ চুন হয়ে গেছে।
"ও... ওর... ইনি হলেন আমার মামাতো ভাই।"
গোপাল বাবু শান্তভাবে বললেন, "তোমার কোনো মামাতো ভাই নেই রেখা। তোমার মামা মারা গেছেন তিরিশ বছর আগে, কোনো সন্তান ছিল না।"
নিঃশব্দতা।
সেই নিঃশব্দতা ছিল হাজার কথার চেয়ে ভারী।
অষ্টম পর্ব — পাড়ার রায়
পাড়ায় কথা ছড়িয়ে পড়তে সময় লাগল না।
মানুষ কথা বলে। পাড়ার মানুষ আরো বেশি বলে।
কিন্তু এবার কথাটা রেখা ভাবিকে নিয়ে।
যে মানুষটা এতদিন অন্যদের চরিত্রের বিচারক ছিলেন, আজ তাঁর নিজের চরিত্র বিচারের কাঠগড়ায়।
পাড়ার মানুষ পেছনে ফিরে তাকাল। মনে পড়ল — যে মেয়েটার নামে রেখা ভাবি কথা বলেছিলেন, সে আসলে রাতে ফিরত নার্সিং ডিউটি করে। যে বউটাকে "খারাপ" বলা হয়েছিল, সে আসলে শাশুড়ির ওষুধের টাকার জন্য পার্টটাইম কাজ করত।
যাদের চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছিল — তারা সবাই আসলে লড়াই করে বাঁচছিল।
আর যিনি প্রশ্ন তুলেছিলেন — তিনি নিজে কী করছিলেন?
করুণা দেবী একদিন মিতুর হাত ধরে কাঁদলেন।
"মা, আমাকে মাফ করো। আমি ভুল মানুষের কথা বিশ্বাস করেছিলাম।"
মিতু শুধু বলল, "মা, থাকতে হয় কাছের মানুষদের বিশ্বাস করেই।"
নবম পর্ব — রেখা ভাবির একাকীত্ব
রেখা ভাবির জীবনে যা হলো, সেটা শাস্তি ছিল না।
সেটা ছিল পরিণতি।
গোপাল বাবু কাউকে কিছু বললেন না। শুধু ঘরে একটা নিঃশব্দতা নামল, যে নিঃশব্দতা শব্দের চেয়ে বেশি কথা বলে।
পাড়ার মানুষ দূরে সরে গেল। যে বাড়িতে রেখা ভাবির ডাক পড়ত সব অনুষ্ঠানে — সেই বাড়িগুলোর দরজা আস্তে আস্তে বন্ধ হয়ে গেল।
রেখা ভাবি একা হয়ে গেলেন।
বিকেলে ছাদে উঠলে আর কেউ পাশে এসে বসে না। চায়ের দাওয়াত আসে না। বিয়েবাড়িতে ডাক পড়ে না।
তিনি বুঝলেন — সম্পর্ক গড়তে লাগে বিশ্বাস, ভাঙতে লাগে মাত্র একটা সত্য।
একদিন সন্ধ্যায় তিনি হাসনা বেগমের দরজায় গেলেন।
হাসনা বেগম দরজা খুললেন।
রেখা ভাবি বললেন, "আপা, আমি..."
হাসনা বেগম বললেন, "ভেতরে এসো।"
দশম পর্ব — আয়নার সামনে
সেই ঘরে দুজন নারী বসলেন।
একজন জীবনের শেষ প্রান্তে। একজন জীবনের মাঝখানে।
রেখা ভাবি বললেন, "আমি কেন এটা করেছিলাম, আপা? আমি কি এতটাই খারাপ মানুষ?"
হাসনা বেগম চুপ করে রইলেন কিছুক্ষণ।
তারপর বললেন, "খারাপ মানুষ বলে কিছু নেই রেখা। ভীরু মানুষ আছে। যে মানুষ নিজের ভুলকে ভয় পায়, সে অন্যের ভুল খোঁজে। যে নিজের ভেতরটা অন্ধকার, সে অন্যের আলো নিভিয়ে দিতে চায়।"
"তুমি কি কখনো নিজের দিকে তাকিয়েছ? আয়নায় — সত্যিকারের আয়নায়?"
রেখা ভাবি মাথা নিচু করলেন।
"তুমি যা করেছ, সেটার ক্ষমা নেই হয়তো। কিন্তু পরিবর্তন আছে। যে মিতুর সংসার ভাঙতে চেয়েছিলে — তার কাছে গিয়ে দাঁড়াও। কথায় নয়, কাজে।"
একাদশ পর্ব — মিতুর উত্তর
কয়েকদিন পর।
মিতু বাজার থেকে ফিরছিল। গলির মোড়ে রেখা ভাবির সাথে দেখা।
রেখা ভাবি দাঁড়িয়ে পড়লেন।
"মিতু..."
মিতু থামল।
"আমি... আমি ভুল করেছিলাম। তোমার সাথে অনেক অন্যায় হয়েছে আমার জন্য। আমি জানি ক্ষমা চাওয়ার অধিকার আমার নেই।"
মিতু কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর বলল, "ভাবি, আমি আপনাকে ক্ষমা করলাম। কারণ আমি ঘৃণা বুকে নিয়ে বাঁচতে চাই না।"
"কিন্তু একটা কথা বলি? আপনি অনেক বুদ্ধিমান মানুষ। অনেক বিচক্ষণ। এই বুদ্ধি যদি অন্যকে ছোট করতে না লাগিয়ে নিজেকে গড়তে লাগাতেন — তাহলে আপনি অনেক বড় মানুষ হতেন।"
রেখা ভাবির চোখে জল এলো।
মিতু সামনে হাঁটতে লাগল।
উপসংহার — আয়না যা বলে
শিউলিপাড়া এখনো আছে।
মিতু এখনো অফিস করে, সন্ধ্যায় ফেরে, ছাদে উঠে বাতাস খায়। সুজন এখন স্ত্রীর পাশে দাঁড়ায়। করুণা দেবী এখন মেয়ের মতো ভালোবাসেন মিতুকে।
হাসনা বেগম জানালার পাশে বসেন। তসবিহ টানেন। মুখে হাসি।
রেখা ভাবি এখনো পাড়ায় থাকেন। তবে এখন আর কারো চরিত্র বিচার করেন না। মাঝে মাঝে মিতুর বাড়িতে যান। চা খান। চুপ করে বসে থাকেন।
হয়তো শিখছেন।
হয়তো বুঝছেন — যে মানুষ সবচেয়ে উঁচু গলায় অন্যের চরিত্র নিয়ে কথা বলে, সে আসলে নিজের চরিত্র থেকে পালাচ্ছে।
আয়না কখনো মিথ্যা বলে না।
কিন্তু আমরা অনেকেই আয়নার দিকে তাকাই না।
অন্যের মুখে আয়না ধরাই আমাদের কাজ হয়ে যায়।
"নিজেদের চরিত্রের ঠিক নেই, তারা আসে অন্যদের চরিত্র বিচার করতে।"
— এই সত্য যুগে যুগে এক।

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন